ফেনীর পরশুরামের মুহুরীর চরের দখল সমাধান অনিশ্চয়তা, আবারো জরিপ চায় ত্রিপুরা সরকার

পরশুরামের মুহুরীর চর

mohurinodir chor parashuramফেনীর পরশুরামের মুহুরীর চরে আবারো জরিপ চায় ত্রিপুরা সরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল দফায় দফায় জরিপ পরিচালনা করে সীমানা নির্ধারণের পরও নিজেদের জমিতে যেতে পারছেন না বাংলাদেশীরা । ভারতের পক্ষ থেকে স্থায়ী পিলার নির্মাণ ও চুড়ান্তভাবে মেনে না নেয়ায় দীর্ঘ ৬৮ বছরেও বির্তর্কিত মুহুরীর চরের সমাধান হয়নি। এতে ৭০ একর জমির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চিয়তা থেকেই গেল । বাংলাদেশের পক্ষ থেকে স্থায়ী পিলার স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হলেও ভারত বার বার সময় চাওয়ায় স্থায়ী পিলার হচ্ছে না ।

দু-দেশের বিতর্কিত ও বিরোধপূর্ণ সীমান্ত সমস্যাকে ছিটমহল আখ্যা দিয়ে মুহুরীরচর ছিলমহল বিনিময়ের আগে আরেক দফা জরিপ চালানোর আহবান জানিয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যের পক্ষ থেকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাছে চিঠি লিখেছেন রাজ্যের রাজস্ব বিষয়ক মন্ত্রী বাদল চৌধুরী সূত্রে এমনটি জানাগেছে ।

জানা গেছে , মুহুরীর চর দখলে রাখতে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯৯ সালের ২২ আগষ্ট পর্যন্ত ৫৮ দিন ভারতীয় বিএসএফ ও বিজিবির(বিডিআর) গুলি বিনিময় হয়েছে। ১৯৯৪ সালের ১৫ই জানুয়ারি বিএসএফ এর গুলিতে প্রাণ হারান বাংলাদেশর বাউর পাথর গ্রামের বেয়াধন বিবি(৪০) । স্থানীয়রা জানিয়েছেন, চরের নিজেদের জমির অধিকার ফিরে পেতে এ পর্যন্ত শতাধিক বাংলাদেশী আহত হয়েছেন বিএসএফ ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে । আর শুধু কয়েক মাসে বিলোনীয়া সীমান্ত দিয়ে ১০ বাংলাদেশীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল ভারতীয় বিএসএফ। ভারত মুহুরীর চরের বড় অংশ জোরপূর্বক দখলে রাখলেও বাংলাদেশের জমির মালিকরা বিএসএফ এর বাঁধার কারণে এসব জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেনা।

দীর্ঘ দিন বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চরের ২.৫ কি.মি. সীমান্ত এলাকা চিহ্নিত করা যায়নি। ২০১১ সালে বাংলাদেশ জরিপ অধিদপ্তর এ সীমানা চিহ্নিত করতে জরিপ পরিচালনা করলেও তা ফলপ্রসু হয়নি বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে দু-দেশের জরিপ দল সীমানা নির্ধারণ করলেও ত্রিপুরা সরকার আবারো জরিপের দাবি তুলে কেন্দ্রে চিঠি দেয়ায় মুহুরীরচর বিরোধ মীমাংসা ঝুলে গেল ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পাকিস্তান ও ভারত দু’টি আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়। দেশ বিভাগের পর থেকে মুহুরীর বিশাল আয়তনের চর নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। যৌথ নদী কমিশনের (জে আর সি) বৈঠকে এ চরকে ডিসপুটেড বা অমীমাংসিত হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু বিএসএফ এর তৎপরতায় বিরোধপূর্ণ চরের ৬৬ একর জমি ভোগ দখল করছে ভারতীয়রা। নদী ভাঙ্গনের ফলে ও গতি পথ পরিবর্তনের কারণে মুহুরীর চরের সৃষ্টি হয়। এ চরের মুল আয়তন ৯২.৩৩ একর এর মধ্যে ৬৬ ভাগ ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি ২৪ ভাগ চর এলাকা অমীমাংসিত। বিজিবির দাবি, এ চরের আয়তন ৭৯ একর। এর মধ্যে ৫০ একর চর ডিসপুটেড।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সার্বভৌম অঞ্চল মুহুরীর চরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ভারত দখলে নিয়েছে। উন্নততর প্রকৌশল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের মুহুরী নদীতে স্পার ও গ্রোয়েন নির্মাণের মাধ্যমে নদীর গতিধারাকে ভারত ক্রমান্বয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশের ভূ-অভ্যন্তরে সু-কৌশলে বিলোনীয়ার পাশে নিজ কালিকাপুর গ্রামের মুহুরী নদীর বাকে চরের অংশটি মূল চরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ কারণে ক্রমাগত উত্তর অংশে (ভারত) চরের সৃষ্টি হয়ে নদী মোহনা বাংলাদেশের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে।

মুহুরী নদীর পানি তাত্ত্বিক ও ভূ-রৃপ তাত্ত্বিক পরিস্থিতি বিশেষণে দেখা যায়, ভারত মুহুরী নদীর উজানে ড্যাম, গ্রোয়েন ও স্পার নির্মাণের ফলে ক্রমান্বয়ে মুহুরী নদীর স্রোতধারা বাংলাদেশের ভূ-ভাগে অভ্যন্তরে পশ্চিম থেকে কূল ভেঙ্গে অবস্থান পরিবর্তন করছে। ভারত জোরপূর্বক মধ্যস্রোত সীমান্তনীতির অজুহাতে বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের প্রায় ১ কি.মি অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছে ।

জানা যায় , ১৯৭৯ সালে আবার বাংলাদেশ ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক বসে। এ সময় উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে, দু-দেশের যৌথ জরিফ পরিচালিত না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল এ নতুন চরাঞ্চলে যে কোন দখল বা চাষাবাদ নিষিদ্ধ থাকবে। এ এলাকাকে অমীমাংসিত বলে ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯৭৯ সালের বৈঠকের পর বিলোনীয়ার মুহুরীর চর নিয়ে কোন বৈঠক বা উলেখযোগ্য আলোচনা হয়নি। আর এ সুযোগ নিয়েছে ভারত। নানা কৌশলে এ চর তাদের দখলে রাখতে চেষ্টা করছে ভারত এমন অভিযোগ ফেনীর সীমান্তবর্তী উপজেলা পরশুরামবাসীর।

নিজ কালিকাপুর সীমান্তের ২১৫৯ পিলার থেকে স্থলবন্দরস্থ ২১৬০ পিলার পর্যন্ত মাঝখানে প্রায় ৪৭টি সাবপিলার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৯২ একর সম্পত্তি বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চর হিসাবে অবস্থিত। অথচ ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ সরকারের তৈরিকৃত (সিএস) মৌজা ম্যাপে এ চরটি বাংলাদেশের আওয়ায় এবং কি ১৯৩০ সালে বিলোনিয়া রেলষ্টেশন নির্মানের জন্য অধিগ্রহনকৃত সম্পত্তি (আংশিক) এ বিরোধপূর্ণ মুহুরীর চরের মধ্যে রয়েছে।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে উভয় দেশ মুহুরীর চরে জরিপ পরিচালনা করে। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর আর্ন্তজাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী মুহুরীর চর সফরে এসে বলেছিলেন, ভারতের সংসদে অনুমোদনের পর পাকা সীমানা পিলার নির্মান করা হলে মুহুরীর চরের দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তি হবে। দু-দেশের জরিপ দল অস্থায়ী পিলার স্থাপনের পর বাংলাদেশ কমপক্ষে ৬০-৭০ একর জমি ফেরত পায়েছে বলে এলাকাবাসী ও গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়। কয়েক দশকের বিরোধ মীমাংসা ও দু-দেশের মালিকানা নির্ণয় করতে যৌথ জরিপ করে অস্থায়ী পিলার স্থাপন করা হলেও স্থায়ী পিলার না হওয়ায় মুহুরীরচরে চাষাবাদ করতে পারছে না বাংলাদেশীরা । বার বার বাংলাদেশের পক্ষ যৌথ জরিপ দলের স্থাপন করা অস্থায়ী পিলারের স্থলে স্থায়ী পিলার স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হলেও ভারতের সাড়ার পরিবর্তে তারা বার বার সময় চেয়ে সময় পার করছে ।

বার্তা সংস্থা পিটিআই’র খবরে বলা হয়, ত্রিপুরা সরকারের পক্ষ থেকে ত্রিপুরার রাজস্ব বিষয়ক মন্ত্রী বাদল চৌধুরী আরেক দফা মুহুরীরচরে জরিপ চালানোর আহবান জানিয়েছেন । এতে বলা হয়েছে, ওই চিঠির একটি কপি গত বৃহস্পতিবার মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করা হয় । এতে বাদল চৌধুরী লিখেছেন, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ জরিপ দল যে জরিপ করেছে তাতে ত্রিপুরা রাজ্য সরকার বা স্থানীয় জেলা প্রশাসনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি । এর ফল হিসেবে মুহুরী নদীর উজানের জমি বাংলাদেশের বলে চিহিৃত করা হয়েছে । এ অবস্থায় ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে এবং তাই তিনি কেন্দ্রিয় সরকারকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আহবান করেছেন । মুহুরীরচর সীমান্ত সমস্যা হলেও চিঠিতে একে মুহুরীর চরকে ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চালে মুহুরীরচর হিসেবে পরিচিত ছিটমহল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । যদিও দু-দেশের বৈঠকে কখনো মুহুরীরচরকে ছিটমহল হিসেবে দেখানো হয়নি । সীমান্ত এলাকা ঘুরে জানাগেছে, দু-দেশের যৌথ জরিপের মাধ্যমে অস্থায়ী সীমান্ত পিলার স্থাপন করে দু-দেশের সীমানা নির্ধারণের পরও বাংলাদেশের প্রাপ্ত জমিতে বিএসএফর বাধায় চাষাবাদ করতে পারছে না বাংলাদেশীরা । সীমানা নির্ধারণের পর বাংলাদেশীরা মুহুরীরচরে আবারো চাষাবাদ করে জীবন জীবীকার সংস্থান করবেন এবং নিজেদের হারানো জমিতে ভোগ দখলের অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় আনন্দিত হয়েছিলেন । কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ এবং ভারত সরকার স্থায়ী পিলার নির্মাণ না হওয়ায় জমির অধিকার ফিরে পাচ্ছে না । এখনো পূর্ণতা পায়নি তাদের সে আশা ।

এ ব্যাপারে শনিবার বিকেলে জানতে চাইলে,বিজিবির ফেনীর জয়লস্কর সদর দপ্তরের কমান্ডিং অফিসার লে.কর্ণেল আহম্মেদ জোনায়েদ খান জানান, দু-দেশের জরিপ সম্পূর্ণ হওয়ায় মুহুরীরচর নিয়ে দু-দেশের মধ্যে দীর্ঘ দিনের সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি হলেও ভারতকে স্থায়ী পিলার স্থাপনের প্রস্তাব দেয়া হলে সময় চাওয়ায় স্থায়ী পিলার এখনো স্থাপন হয়নি ।

Share and Enjoy

  • Facebook
  • Twitter
  • Delicious
  • LinkedIn
  • StumbleUpon
  • Add to favorites
  • Email
  • RSS





Related News

  • ফেনীর সিভিল সার্জনের উদ্যোগে পরশুরামের এসএসসি পরীক্ষার্থী ওহাব নবীর চিকিৎসা শুরু
  • পরশুরামে উপজেলা প্রশাসন ও আওয়ামীলীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপি কর্মসুচী পালিত।
  • পরশুরাম হোসনে আরা বেগম (রানী) চৌধুরী ডায়াবেটিক এন্ড জেনারেল হাসপাতালের উদ্বোধন
  • পরশুরামের মেয়র সাজেল চৌধুরীর খামারে কোরবানীর জন্য প্রস্তুত আড়াই কোটি টাকার দেশী গরু
  • পরশুরামে ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন কর্মসুচী
  • পরশুরামে আসন্ন কোরবানী উপলক্ষে খামারীদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্টিত
  • বঙ্গবন্ধুর খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবিতে পরশুরাম উপজেলা ছাত্রলীগের উদ্যোগে মানববন্ধন ও স্বারকলিপি প্রদান।
  • পরশুরামে ৪ ডাকাতকে আটক করে পুলিশে দিল এলাকাবাসী
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
    Email
    Print