বাবুল আক্তারকে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ

ঢাকা অফিস-7196a325a455e4f15f6b87e4cc41c8aa-Untitled-25

স্ত্রী মাহমুদা খানমের (মিতু) হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হলেন তাঁর স্বামী বহুল আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তার। গত শুক্রবার গভীর রাতে ঢাকার শ্বশুরবাড়ি থেকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে সাড়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাঁকে। গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে খিলগাঁওয়ের ভুঁইয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় এই পুলিশ কর্মকর্তাকে।
পুলিশ সুপার পদের একজন কর্মকর্তাকে এভাবে গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যেই ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আবার বাবুলকে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে স্বজনদের মধ্যে তৈরি হয় সন্দেহ আর উদ্বেগ।
গতকাল দিনভর সংবাদ মাধ্যমে এ খবর আসায় গুঞ্জন ডালপালা মেলতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গতকাল দুপুর পর্যন্ত পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁকে কেন নেওয়া হয়েছে, কোথায় নেওয়া হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নে পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নীরব ছিলেন। তবে দুপুরের দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

দীর্ঘ সময় বাবুলকে কোথায় রাখা হয়েছিল—জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদা খানম খুনের ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের একটি দল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এরপর বিকেলে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়।
২০ দিন আগে ৫ জুন সকালে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের জিইসি এলাকায় গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হন বাবুলের স্ত্রী মাহমুদা খানম। এ মামলায় আটক তিন সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করতে বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কী তথ্য, তা পুলিশ স্পষ্ট করে বলছে না।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা কথা উঠলে তা তো পরিষ্কার করতে হবে। বাবুল আক্তারকে নিয়ে ক্রিমিনালদের সামনাসামনি করা হয়েছে। তারা যা বলেছে তা যাচাই করা হয়েছে।’ কিন্তু এই খুনের ঘটনা নিয়ে নানা জন নানা মন্তব্য করছে। কেউ কেউ তাঁদের পারিবারিক বিষয়েও মন্তব্য করছেন। এসব কি সত্যি? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘হতে পারে। তবে এখনো প্রকাশ করার সময় আসেনি, আমরা সবকিছুই প্রকাশ করব আরও একটু সময় নিয়ে।’
বাবুলের দুজন সোর্স ও একজন সোর্সের আত্মীয় ধরা পড়েছে, তাদের বাবুল চেনেন বলে পুলিশ বলেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। দু-একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর বেরিয়েছে, খুনের সঙ্গে বাবুল জড়িত। এ বিষয়ে মোশাররফ বলেন, তিনি কিছু জানেন না। নিরপরাধ কাউকে যেন গ্রেপ্তার করা না হয়, তিনি পুলিশের প্রতি সেই অনুরোধ জানান।
চট্টগ্রাম পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদা খুনের ঘটনায় নয়জনের একটি দল জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এদের মধ্যে চারজন খুনের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। পুলিশ এ চারজনের মধ্যে মুসা, নবী ও ওয়াসিম নামের তিনজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এদের একজন বাবুলের সোর্স ছিল বলে তদন্তকারীরা জানতে পারেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ সূত্রের মতে, ওই তিনজন ভাড়াটে খুনি। মুসা নামে তাদের একজনকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য টাকা দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাবুল আক্তার গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, মুসা, নবী ও ওয়াসিম নামের কাউকে তিনি চেনেন না। কেন তাঁকে গভীর রাতে আটক করা হলো, জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, ‘আমি মামলার বাদী। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নেওয়া হয়েছিল।’ স্ত্রীর সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘না, এমন কিছু ছিল না। আমাদের সম্পর্ক ভালো ছিল।’ ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে সাড়ে ১৫ ঘণ্টা কী জিজ্ঞেস করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্রিমিনালরা অনেক তথ্য দিয়েছে, তা নিয়ে এবং তদন্তের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতে ডেকে নেওয়া হয়েছিল।’
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, বাবুল আক্তার স্ত্রী হত্যা মামলার বাদী। মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য পাওয়ার জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
স্ত্রী খুন হওয়ার পর থেকে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ভুঁইয়াপাড়ার শ্বশুরবাড়িতেই আছেন পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার। তাঁর শ্বশুর মোশাররফ হোসেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। বাবা আবদুল ওয়াদুদ মিয়াও পুলিশে চাকরি করেছেন।
শ্বশুর মোশাররফ হোসেন গতকাল বিকেলে তাঁর বাসায় প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদার মৃত্যুতে শুক্রবার ২৪তম বিসিএসের ক্যাডারদের শোকসভা, দোয়া ও ইফতার ছিল পুলিশ অফিসার্স মেসে। সেখানে বাবুল, তাঁর দুই সন্তান এবং তিনি ও বাবুলের বাবা অংশ নেন। ইফতারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইফতার শেষে বাবুল তাঁদের বলেন, আইজিপি তাঁকে দেখা করে যেতে বলেছেন। দেখা করার জন্য তিনি রমনা কমপ্লেক্সে এক সহকর্মীর বাসায় অপেক্ষা করেন। এরপর তাঁরা বাসায় চলে যান। বাবুল ফেরেন রাত সাড়ে ১১টার দিকে। ফিরে এসে ভবনের নিচ থেকে তাঁকে ফোন করেন। তিনি নিচে নেমে দেখেন, খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মাইনুল ইসলাম বসে আছেন। বাবুল বাসার ভেতরে চলে যান।
মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন মতিঝিল অঞ্চলের উপকমিশনার (ডিসি) আনোয়ার হোসেন। তিনি বাসায় আসার পর থেকে খুব অস্থির হয়ে ওঠেন। একবার বসছিলেন, একবার দাঁড়াচ্ছিলেন। একপর্যায়ে ডিসি বললেন, আইজিপি বাবুলের সঙ্গে কথা বলতে চান, তাঁকে যেতে হবে। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ওসি ও ডিসি দুজনই বাবুলকে নিয়ে বেরিয়ে যান। এর আধা ঘণ্টা পর বাবুলের মুঠোফোন বন্ধ হয়ে যায়। বাবুলকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁর ছেলে গলা ধরে বসে ছিল। অনেক বুঝিয়ে তাকে শান্ত করা হয়।
মাহমুদার ছোট বোন শায়লা মোশাররফ প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেটা সারা রাত ঘুমায়নি। অনেক কান্নাকাটির পর সকাল সাতটার দিকে ঘুমাতে যায়। আর ছোট মেয়ে ঘুম থেকে উঠেই বাবা কোথায়, বাবা কোথায় জিজ্ঞেস করা শুরু করে।
বাবুলের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ‘গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ডিবির ডিসি মাহবুব আলম বাবুলকে আমাদের গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে যান। এরপর বাবুল হেঁটে বাসায় আসেন।’ বিকেলে ভুঁইয়াপাড়ায় গিয়ে বাবুল আক্তারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তাঁর শ্বশুর বলেন, ‘বাবুল ১২-১৪ ঘণ্টা বিশ্রাম পায়নি। বাসায় ফেরার পর গোসল করে ঘুমিয়ে গেছে। শুক্রবার রাতে যাওয়ার আগে বাবুল কিছু খায়নি, হয়তো আজও দিনভর কিছু খায়নি। বাসায় ফেরার আগে আমাকে এসএমএস দিয়ে বলেছে কারও সঙ্গে কথা না বলতে।’
বাবুল কেন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চান না, জানতে চাইলে তাঁর শ্বশুর বলেন, হয়তো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁকে কথা না বলার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। বাবুলের কাছে পুলিশ কী জানতে চেয়েছে—প্রশ্ন করা হলে মোশাররফ বলেন, এ নিয়ে বাবুলের সঙ্গে কথা হয়নি।
মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবুল ভালো অফিসার। তার ভালো কাজের কারণে অনেকেই পেশাগত দিক থেকে হিংসা করে। সে ঈর্ষার শিকার হতে পারে। আবার পুলিশ ফোর্সের ভেতরে বা বাইরে এমন কিছু ব্যক্তি থাকতে পারেন, যাঁরা তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বাবুলের বিষয়ে কিছু একটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, যার কারণে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের আগে গত শুক্রবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য প্রথম আলোকে বলেন, মাহমুদার খুনে অংশ নেওয়া মোটরসাইকেল আরোহী তিন যুবককে শনাক্ত করা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
৫ জুনের এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ জানিয়েছিল, জঙ্গি দমনে বাবুল আক্তারের সাহসী ভূমিকা ছিল। এ কারণে জঙ্গিরা তাঁর স্ত্রীকে খুন করে থাকতে পারে।
তবে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছিল আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখা। একিউআইএসের কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল-ইসলাম এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানায় বলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর অনলাইন তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ‘সাইট’ খবর প্রচার করে। এতে বলা হয়, ইসলামে এটি গর্হিত কাজ।
সাম্প্রতিক গুপ্তহত্যার বেশির ভাগ ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে আইএস ও আল-কায়েদার কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল-ইসলাম। নিন্দা জানানোর ঘটনা এটাই প্রথম।

Share and Enjoy

  • Facebook
  • Twitter
  • Delicious
  • LinkedIn
  • StumbleUpon
  • Add to favorites
  • Email
  • RSS





Related News

  • বাংলাদেশের অনুরোধে সাড়া দিয়েছে গুগল
  • পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির পরীক্ষা আগের মতোই চলবে
  • চার লেনের উদ্বোধন ২ জুলাই, সাড়ে চার ঘণ্টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম
  • বাবুল আক্তারকে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ
  • ঢাকা মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ২৬ জুন থেকে
  • হজ ফ্লাইট শুরু হবে আগামী ৪ আগস্ট
  • জামায়াতের লোগো পরিবর্তন ?
  • শুভ জন্মদিন দৈনিক যায়যায়দিন
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
    Email
    Print